হিন্দুধর্ম অনুযায়ী বিশ্বজগতের সৃষ্টিতত্ত্ব কি আসুন জেনে নিই

According to Hinduism, what is the cosmology of the universe?আজবাংলা সৃষ্টিতত্ত্ব হিন্দুধর্মের অন্যতম আলোচনার বিষয়। কিন্তু অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে এর উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ধর্মীয় স্বীকার্য বিষয় ছাড়াও এর রয়েছে দার্শনিক ভিত্তি। পৃথিবীর অন্যান্য প্রধান ধর্মের মতো হিন্দুধর্ম একক কোনো প্রধান ধর্মগ্রন্থ অনুসরণে গড়ে উঠেনি। এতে প্রাচীন ঋষিদের রচিত গ্রন্থের সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পৌরাণিক উপাখ্যান। এখানে যেমন রয়েছে বেদ, তেমনি রয়েছে মহাভারত। বেদের ‘নাসাদীয় সূক্ত’ ও ‘হিরণ্যগর্ভ সূক্ত’ এই দুটি সূক্তে মহাবিশ্ব সৃষ্টির অপূর্ব রহস্য বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই সূক্ত দুটি আধুনিক বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক আলোচিত। কারণ, সূক্ত দুটিতে মহাবিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা বর্তমান বিজ্ঞানের ধারণার সাথে প্রায় পূর্ণাঙ্গ মিলে যায়। দেখে নেয়া যাক নাসাদীয় সূক্ত ও হিরণ্যগর্ভ সূক্তে কী বলা হয়েছে:  সেকালে যা নেই তাও ছিল না, যা আছে তাও ছিল না। পৃথিবী ছিল না, অতি দূরবিস্তৃত আকাশও ছিল না। আবরণ করে এমন কী ছিল? কোথায় কার স্থান ছিল? দুর্গম ও গম্ভীর জল কি তখন ছিল?” ঋগ্বেদ, ১০/১২৯/১ “তখন মৃত্যু ছিল না, অমরত্ব ছিল না; রাত্রি ও দিনের প্রভেদ ছিল না। কেবল সেই একমাত্র বস্তু বায়ুর সহকারিতা ব্যতিরেকে আত্মা মাত্র অবলম্বনে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস যুক্ত হয়ে জীবিত ছিলেন। তিনি ব্যতীত আর কিছুই ছিল না।” ঋগ্বেদ, ১০/১২৯/২ “সর্বপ্রথম অন্ধকার দ্বারা আবৃত ছিল। সমস্তই চিহ্নবর্জিত ও চতুর্দিক জলময় ছিল। অবিদ্যমান বস্তু দ্বারা সে সর্বব্যাপী আচ্ছন্ন ছিলেন। তপস্যার প্রভাবে এক বস্তুর জন্ম নিলেন। সেখান থেকে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হল।” ঋগ্বেদ, ১০/১২৯/৩ বেদের হিরণ্যগর্ভ সূক্তে বলা হয়েছে: “সর্বপ্রথম হিরণ্যগর্ভই সৃষ্টি হল অর্থাৎ সর্বপ্রথম জলময় প্রাণের উৎপত্তি হয়। এখানে প্রথম প্রাণকে প্রজাপতি (ব্রহ্মা) বলা হয়েছে।” ঋগ্বেদ, ১০/১২১/১ “ভূরি পরিমাণ জল সমস্ত বিশ্বভূবন আচ্ছন্ন করে ছিল, সেখানে অগ্নির উৎপত্তি হল। এভাবে গলিত উত্তপ্ত তরল থেকে প্রাণরূপ দেবতার উদ্ভব হয়।” ঋগ্বেদ, ১০/১২১/৭  মার্কেণ্ডয় পুরাণ মতে- ‘যা অব্যক্ত এবং ঋষিরা যাকে প্রকৃতি বলে থাকেন, যা ক্ষয় বা জীর্ণ হয় না, রূপ রস গন্ধ শব্দ ও স্পর্শহীন, যার আদি অন্ত নেই, যেখান থেকে জগতের উদ্ভব হয়েছে, যা চিরকাল আছে এবং যার বিনাশ নেই, যার স্বরূপ জানা যায় না, সেই ব্রহ্ম সবার আগে বিরাজমান থাকেন। সৃষ্টি প্রক্রিয়া বিভিন্ন স্তরে সম্পন্ন হয়। এখানে তিনটি গুণ রয়েছে। এই তিনটি গুণ হলো সত্ত্ব, রজ ও তম। সত্ত্ব হলো প্রকৃতি। রজের প্রভাবে অহংকারসহ অন্যান্য খারাপগুণের জন্ম এবং তম হলো অন্ধকার।  আবার বেদের ব্রাহ্মণে একই কথা বলা হয়েছে: “প্রথমে হিরণ্যগর্ভ সৃষ্টি হল। সেখানে ছিল উত্তপ্ত গলিত তরল। এটি ছিল মহাশূন্যে ভাসমান। বছরের পর বছর এই অবস্থায় অতিক্রান্ত হয়।” শতপথ ব্রাহ্মণ ১১/১/৬/১  “গলিত পদার্থের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটল। একক বিন্দু থেকে সকল কিছু প্রসারিত হতে শুরু করল। তার এক জীবনপ্রদ অংশ থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হল। বিস্ফোরিত অংশসমূহ থেকে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র তৈরি হল। তারপর সৃষ্ট ক্ষেত্রে সাতধাপে সংকোচন-প্রসারণ সম্পন্ন হল। তারপর সৃষ্টি হল ভারসাম্যের।” ঋগ্বেদ, ১০/৭২/২-৪, ৮-৯

Leave a Reply