চলুন ঘুরে আসি মেঘ-বৃষ্টির সাথে

Meghalaya
মেঘালয়

আজবাংলা উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যের উত্তর ও পূর্ব দিকে অসম (আসাম) রাজ্য এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র অবস্থিত। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং। মেঘালয় হচ্ছে মেঘেদের বাড়ি। কবিদের অনুপ্রেরনার ও চিত্রকরদের ক্যানভাস। বেড়ানোর জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় জায়গা। ২১ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে রাজ্য হিসাবে ঘোষনা হয়। মেঘালয় ছবির মত সুন্দর একটি রাজ্য। কালচার ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, মেঘের সমাবেশ, জীবনের কিছু রঙ্গিন মুহত্ব কাটানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা। মেঘালয় সেভেন সিস্টার খ্যাত উত্তর পূর্ব অঞ্চলে অত্যতম একটি সুন্দর রাজ্য। মেঘালয় পাঁচটি প্রশাসনিক জেলায় ভাগ হয়েছে- জয়িন্তা পাহাড়, পূর্ব এবং পশ্চিম গারো পাহাড়, পূর্ব এবং পশ্চিম খাসি পাহাড়।  শিলং ইংরেজী (Shillong), উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যেও পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। এটি মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী। শিলং বাংলাদেশ -ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে এবং ভূটান-ভারত সীমান্তের প্রায় ১০০ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। এটি খাসি পাহাড়ে প্রায় ১৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এখানে রয়েছে পাইন অরণ্য, জলপ্রপাত এবং পার্বত্য জলধারার সমারোহ। এক সময় এটি ”প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৯৭ সালে এক ভূমিকম্পে শহরটি ধবংস হয়ে যায় এবং এরপর এটিকে পুনরায় গড়ে তোলা হয়।

Cherrapunji
ব্রিটিশ ধাঁচে নির্মিত কান্ট্রিহাউজ দেখতে পাওয়া যায়

ভারতের স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ পরিবারদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি রির্সট ছিল। এখানে এখনও প্রচুর ব্রিটিশ ধাঁচে নির্মিত কান্ট্রিহাউজ দেখতে পাওয়া যায়। শিলং-এ আশে পাশের এলাকায় উৎপাদিত কমলা, তুলা, আলু ইত্যাদি কেনাবেচা হয়। এখানে মাইকা, জিপসাম এবং কয়লার মজুদ থাকার সম্ভাবনা আছে, তবে এগুলি এখনও তেমন করে উত্তোলিত হয়নি। এখানে তেমন কোন বড় শিল্পকারখানা নেই। বনাঞ্চল উজাড়ের প্রবণতা বাড়ছে। ভারতের ২০০১ সালের আদম শুমারি অনুসারে শিলং শহরের জনসংখ্যা হল ১৩২,৮৭৬জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫০%, এবং নারী ৫০%। এখানে সাক্ষরতার হার ৮০%। পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৩%, এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৭৮%। সারা ভারতের সাক্ষরতার হার ৫৯.৫%, তার চাইতে শিলং এর সাক্ষরতার হার বেশি। এই শহরের জনসংখ্যার ১১% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী। ঘুরে বেড়াতে চাইলে শহরের বাইরে অসংখ্য ঝর্না, পাহাড়। শিলং এ গিয়ে একদিন আশেপাশের পার্ক, ফলস্ এইসব দেখতে পারেন, আরেকদিন যাবেন এলিফ্যান্ট ফল্‌স, শিলং পিক এইসব দেখতে। আছে উমিয়াম লেক নামের চমৎকার একটা লেক। এটা শিলং থেকে একটু বাইরে, এখানে অবশ্যই যাবেন। আপনি একটা ক্যাব একেবারে প্রত্যেকদিনের হিসেবে ঠিক করতে পারেন। প্রচুর ক্যাব ওখানে। আর চেরাপুন্জি।মেঘের জন্য চারপাশে কিছু দেখবেন না। এরমধ্যেও যা দেখবেন পাহাড়ের উপর থেকে মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য যাথেষ্ট। পায়ের নিচ দিয়ে দেখবেন মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। দূর থেকে দেখলে কুয়াশা মনে হতে পারে, আসলে সব মেঘ।মাঝেমধ্যে এমন হয় কিছু দেখা যায়না, হঠাৎ করে সব ফুঁড়ে উঠে। এই অবস্হা অবশ্য শিলংয়েও হতে পারে। এই কারণেই এই রাজ্যের নাম মেঘালয়। মেঘের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কখনে হাত দিয়ে ধরা যায়না। হাতে সময় বেশি থাকলে পাশে ইম্ফল ও ঘুরে আসতে পারেন।

Shillong
শিলং- স্বপ্ন হলেও সত্যি

কীভাবে যাবেন
গৌহাটি স্টেশনেই গাড়ি পেয়ে যাবেন।আগে শিলং যাওয়াই ভালো। শিলং শহর আর তার আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে বেড়িয়ে তারপর সেখান থেকেই এক দিনের জন্য চেরাপুঞ্জি ঘুরে আসতে পারেন। আর যারা শুধু চেরাপুঞ্জি যেতে চান, তারা স্টেশন থেকেই ট্যাক্সি ভাড়া করে নিন। তবে সেখানে থাকার মতো বেশি হোটেল এখনও গড়ে ওঠেনি, ফলে আগে থেকে হোটেল বুকিং না থাকলে বিপাকে পড়ে শিলং ফিরে আসতে হতে পারে। শিলঙে ভালো মানের হোটেলের ভাড়া ১৫০০-২০০০ টাকা/দিন। শিলং শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে থাকার জন্য চমত্কার একটি ব্যবস্থা আছে; নাম চেরাপুঞ্জি হলিডে রিসোর্ট। এটিও আগে থেকে বুকিং দিয়ে যেতে হবে। পাহাড়ের নির্জনে এই রিসোর্টের আশপাশেও রয়েছে ভ্রমণের অনেকগুলো জায়গা। শিলংয়ে হোটেলে বসেই আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোয় বেড়ানোর জন্য হরেকরকম প্যাকেজ পাবেন। এ ছাড়া চেরাপুঞ্জি বেড়ানোর প্যাকেজও পাবেন এখান থেকেই।

 

Cherrapunji
চেরাপুঞ্জি

ভাড়া করা ট্যাক্সিই শিলং ও চেরাপুঞ্জিতে বেড়ানোর সবচেয়ে ভালো বাহন। তবে বড় দল হলে শিলং থেকে বাস ভাড়া করেও চেরাপুঞ্জি বেড়িয়ে আসা জায়। শিলং বা চেরাপুঞ্জিতে থাকা, খাওয়া এবং গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর খরচ  কিছুটা বেশি। শিলংয়ে সারাবছর মনোরম আবহাওয়া মেলে। তবে মার্চ ও জুন মাস বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ মরসুম। গ্রীষ্মে হাল্কা উলের পোশাক ও শীতে ভারি গরমজামার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বৃষ্টিপাত এ অঞ্চলে যখন-তখনই হতে পারে। তাই, ছাতা আর বর্ষাতির বন্দোবস্তও রাখা চাই। এই অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতির বাস, তাই উৎসবেরও আধিক্য। খৃস্টান ধর্মাবলম্বীরা মহা সমারোহে পালন করেন বড়দিন, গুড ফ্রাইডে, ইস্টার, ইত্যাদি। ইংরেজি নব বর্ষেও আনন্দমুখর হয়ে ওঠেন পাহাড়িরা। খাসি উপজাতির মানুষ পালন করেন শাদ সুকমিনসিয়েম পরব। কা পমব্ল্যাং নংক্রেম অথবা নংক্রেম নৃত্যও অতি প্রসিদ্ধ খাসি উৎসব। জয়ন্তীয়া উপজাতীদের পার্বণ বেহদিয়েংখ্‌লাম পালিত হয় প্রতি বছর জুলাই মাসে। গারোরা পালন করেন ওয়াংগালা উৎসব । শিলংয়ে খাবার জায়গা অনেক। বার্গার, পিৎজা, মিল্কশেক, স্যাণ্ডউইচের দোকান রাস্তার মোড়ে হামেশাই পাওয়া যায়। চীনে খাবার ও তিব্বতি মোমো-থুকপাও পাওয়া যায় বেশ কিছু রেস্তরায়। স্থানীয় খাবারের দোকান তেমন না থাকায় খোঁজ নিতে পারেন ট্যুরিস্ট লজের ক্যান্টিনে। মনে রাখা দরকার, ভারতের এই অংশে সাধারণত আমিষ খাদ্যের প্রচলন আছে। নিরামিষ খাবারের সন্ধান পাওয়া যাবে মারওয়াড়ি ভোজনালয়ে ও শিলংয়ের কিছু বাঙালি রেস্তরায়।  বেড়ানো শেষে কেনাকাটা করতে হলে শিলংয়ের পুলিশ বাজারের দোকানগুলোয় যাওয়া যায়। এখানে দরদাম করাটাই দস্তুর। এ ছাড়া শহরে আছে বেশ কিছু অত্যাধুনিক শপিং মল। স্থানীয় উপজাতির মানুষের হাতে তৈরি জিনিসপত্রের সম্ভার পাওয়া যায় এখানে।

Cherrapunji
চেরাপুঞ্জি

চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে গ্রীেষ্ম তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে ৩.৯ থেকে ১৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। উত্তর পূর্ব ভারতের এই প্রান্তে বৃষ্টিপাতের হার বেশি। বর্ষাকাল ছাড়াও বৃষ্টি হতে পারে যে কোনও সময়। বেড়ানোর ভাল সময় ২টো- নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস ট্রেকিং, প্রকৃতি বীক্ষণ, ইত্যাদির জন্য আদর্শ। বৃষ্টির পূর্ণ রূপ দেখতে চাইলে মে থেকে অক্টোবর মাসে আসা উচিত। চেরাপুঞ্জি মানেই বৃষ্টি। ঘরের জানলা দিয়ে অবিশ্রান্ত ধারা দেখতে ভাল লাগলেও বাইরে বের হলে দরকার পড়তে পারে ছাতা, বর্ষাতি ও রবারের জুতো। রওনা হওয়ার আগে সঙ্গে নিতে ভুলবেন না। সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথাব্যাথা ও সাধারণ পেটের অসুখের ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত হবে। পানীয় জল পরিশ্রুত করতে জিওলিন জাতীয় পিউরিফায়ার হাতের কাছে রাখুন।

Leave a Reply