সর্বাধিক বিক্রিত জনপ্রিয়তম মোবাইল ফোনগুলো জেগুলি এখন ইতিহাসের পাতায়

১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল, মটোরোলা কোম্পানির একজন গবেষক, মার্টিন কুপার সর্বপ্রথম সেলফোন আবিষ্কার করেন। তার সেই আবিষ্কার যোগাযোগ ব্যবস্থায় একরকম বিপ্লব সৃষ্টি করে। তারবিহীন টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থার সেই যে শুরু, তারপর থেকে মোবাইল ফোন প্রযুক্তি দিন দিন উন্নত হতে শুরু করে।

Martin Cooper
মার্টিন কুপার তার প্রথম উদ্ভাবিত ফোনের সাথে;

বর্তমানে এমন অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মোবাইল ফোন ব্যতীত কাউকে খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। এ পর্যন্ত এসেছে বহু মোবাইল ফোন, এসেছে বহু মোবাইল ফোন কোম্পানি। তবে মোবাইল ফোনের জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত এমন কিছু ফোন তৈরি হয়েছে যেগুলা পুরো বিশ্বের মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে। চলুন দেখা যাক এমনই নয়টি মোবাইল ফোন যেগুলো গোটা বিশ্বে পেয়েছিলো তুমুল জনপ্রিয়তা।

Motorola RAZR V3, মোট বিক্রয়: ১৩০ মিলিয়ন

Motorola RAZR V3,

  • স্টাইলিশ মটোরোলা রেজার V3;

২০০৪ সালে ফোনটি রিলিজ হবার পর বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তৎকালীন নোকিয়ার ‘ক্যান্ডি-বার ফোন’ এর যুগে এই মটোরোলা ফোনটি মোবাইল ডিজাইনিং এ এক নতুন ধারার সূচনা করে। ফোনটি ছিল খুবই সুন্দর এবং চিকন। পাতলা এই ফোনটির ওজন ছিল মাত্র ৯৫ গ্রাম! সেলফোন বিশ্বে ফোনটি ছিল এক ফ্যাশন আইকন। যদিও ফিচারের দিক দিয়ে উল্লেখ করার মতো কিছু ছিল না, তবে ফোনটির অনন্য ডিজাইনটাই ছিল এটির এত বিক্রির মূল রহস্য। পুরো বিশ্বে ১৩০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়েছে ফোনটি! তবে এই রেজার মডেলটির এত জনপ্রিয়তাই এক সময় কাল হয়ে দাঁড়ায় মটোরোলা কোম্পানির জন্য। মটোরোলা শুধু এই ফোনটির সফলতার উপরেই নির্ভর করে ছিল, যার ফলে যখন টাচস্ক্রিন ফোনের আনাগোনা শুরু হয়ে যায় মোবাইলফোন ইন্ডাস্ট্রিতে, মটোরোলা সেখানে অংশগ্রহণ করতে অনেক দেরি করে ফেলে।

Nokia 3310, মোট বিক্রয়: ১৩৬ মিলিয়ন

Nokia 3310,

  • নোকিয়া ৩৩১০

২০০০ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এই কিংবদন্তী ফোনটি প্রথম তৈরি করা হয়। রিলিজের ১৭ বছর পরেও এই ফোনটি এখনো সমান জনপ্রিয় এবং পরিচিত। যদিও ইন্টারনেটে বিভিন্ন কার্টুন, ট্রল এবং মজার তথ্যের কারণে ফোনটি এখন বেশ ঠাট্টার জায়গা থেকেই পরিচিত নতুন প্রজন্মের কাছে, নোকিয়ার এই মডেলটি আবার বাজারে এসেছে নতুন মোড়কে। তবে মূল ফোনটি জনপ্রিয় ছিল মূলত এর টেকসই গঠন এবং ব্যাটারির দীর্ঘস্থায়ীত্বের জন্য। ফোনটিকে বলা হয় অবিনশ্বর, ধ্বংসাতীত বা অক্ষয়। মজা করে ফোনটিকে ‘মুঠোফোন জগতের চাক নরিস’ও বলা হয়! প্রায় ১৩৬ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হওয়া এই ফোনটির সাথে ব্যাটারি লাইফের দিক থেকে অত্যাধুনিক যুগের কোনো ফোন আজও টেক্কা দিয়ে পারে না। ফোনটির এত জনপ্রিয়তা দেখে HMD Global এর অধীনে নোকিয়া আবার ফোনটি বের করেছে নতুন ডিজাইনে।

Samsung E1100, মোট বিক্রয়: ১৫০ মিলিয়ন

Samsung E1100,
স্যামসাং মডেল- E 1100

স্যামসাংয়ের যে ফোনটি এই লিস্টে জায়গা করে নিয়েছে তা তাদের কোনো ফ্লাগশিপ স্মার্টফোন নয়। এটি তাদের একটি সিম্পল বা ক্যান্ডি-বার ফোন, মডেল- E 1100। ফোনটি বের হয় ২০০৯ সালে এবং ২০১২ সাল অব্দি এটি প্রায় ১৫০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়েছে। এর ফিচার বলতে ছিল 65k কালারের CS TN ডিসপ্লে, ফ্লাশলাইট এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠানোর অ্যাপ্লিকেশন। ১২৮x১২৮ পিক্সেল রেজুলেশন স্ক্রিনের ফোনটির ওজন ছিল ৭০ গ্রাম এবং ব্যাটারি ধারণ ক্ষমতা ছিল ৭৫০ মিলি অ্যাম্পিয়ার, যা স্ট্যান্ডবাইতে প্রায় ১৩ দিন চালু থাকতে সক্ষম ছিল! নোকিয়ার অন্যান্য বার ফোনের সাথে টেক্কা দিয়ে এই ফোনটা যে এত জনপ্রিয় হয়েছিল তা আসলেই বিস্ময়কর।

Nokia 6600, মোট বিক্রয়: ১৫০ মিলিয়ন

 

 

Nokia 6600

২০০৩ সালের স্মার্টফোন বলা হয় নোকিয়া ৬৬০০-কে। বের হবার সাথে সাথে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় ফোনটি। কম বয়সীদের অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত স্মার্টফোনে পরিণত হয় এটি। কারণ তৎকালীন অন্যান্য ফোনের তুলনায় এই মডেলটির বড় স্ক্রিন ছিল, ভিজিএ ক্যামেরাও ছিল যা দিয়ে ছবি তোলা সহ ভিডিও ধারণ করাও যেত। অডিও-ভিডিও স্ট্রিমিং, ব্লুটুথ,৬ মেগাবাইট ইন্টারনাল স্টোরেজ, মেমরি কার্ড ধারণক্ষমতা এবং জাভা সাপোর্টেড অপারেটিং সিস্টেম যার সাহায্যে থার্ড পার্টি এপ্লিকেশনও ডাউনলোড করা যেত; সব মিলিয়ে অনেকের স্বপ্নের ফোন ছিল এটি। বর্তমানের গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরের মতোই তখন GetJar নামক থার্ডপার্টি ওয়েবসাইট থেকে প্রচুর এপ্লিকেশন নামিয়ে ব্যবহার করা যেত এতে। এখনকার এপ্লিকেশনগুলোর মতো অতটা বাস্তবধর্মী বা উপকারী না হলেও, তখন যা অ্যাপলিকেশন পাওয়া যেত, তা-ও নেহাত মন্দ ছিল না। নোকিয়ার ১২০০, ৫২৩০ মডেলগুলোর মতো এটিও ১৫০ মিলিয়নের বেশি বিক্রি হয়েছে।

Nokia 3210, মোট বিক্রয়: ১৬০ মিলিয়ন

Nokia 3210,
নোকিয়ার প্রথম ফোন যার এন্টেনা ভেতরে ছিল

নোকিয়া ৩২১০ বের হয় ১৯৯৯ সালে, এবং এই ফোনটাই হলো নোকিয়ার প্রথম বিগহিট। অবশ্যই এটির ফিচারগুলো খুবই কম ছিল বর্তমান ফোনগুলোর তুলনায়, তবে যে বৈশিষ্ট্যটি এই ফোনটিকে তৎকালীন অন্যান্য ফোনগুলোর থেকে আলাদা এবং আকর্ষণীয় করেছিলো তা হলো, এটিতে ছিল গেমস। এবং অবশ্যই এতে ছিল সেই বিখ্যাত ‘Snake’ গেম। সেই সময়ে ফোনগুলো সাধারণত খুব একঘেঁয়ে ধরনের ছিল এবং সাধারণত ব্যবসায়ী বা চাকুরীজীবীরা ফোন ব্যবহার করতেন। কিন্তু এই ফোনটির দাম অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় এবং গেম থাকার কারণে তা সহজে কম বয়সীদের আকর্ষণ করে। ফোনটি বাজারে থাকা অন্যান্য সব ফোনের সাথে প্রতিযোগিতা করে এবং দেখিয়ে দেয় যে, মুঠোফোন বিনোদনেরও একটি মাধ্যম হবার ক্ষমতা রাখে। নোকিয়া ৩২১০-ই সেই ফোন যা ১৬০ মিলিয়নেরও বেশি ইউনিট বিক্রি হওয়ার মাধ্যমে পরবর্তী কয়েক বছরের জন্য নোকিয়াকে প্রভাবশালী করে দেয়।

Iphone 6 ও 6 plus, মোট বিক্রয়: ২২০ মিলিয়ন

Iphone 6 ও 6 plus
আইফোন ৬ ও ৬ প্লাস

যদি বলা হয় বর্তমান মোবাইল ফোন যুগে সব চেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড কোনটি, তাহলে অবশ্যই অ্যাপলের আইফোনের নাম আসে একবাক্যেই। আইফোন ৫ মডেলটি প্রায় ৭০ মিলিয়ন ইউনিট বিক্রি হয়। এর পরের মডেলটি অর্থাৎ আইফোন ৬ এবং এর বড় স্ক্রিনের মডেলটি- আইফোন ৬ প্লাসের জনপ্রিয়তাই অ্যাপলকে আজ অন্যতম ধনী কোম্পানিতে পরিণত করেছে। বলা হয়, বর্তমানে অ্যাপলের প্রায় ২.৫৬ বিলিয়ন ডলার শুধু ক্যাশই আছে! তো এই আইফোন ৬ সহোদর ২০১৪ সালে বের হবার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২২০ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি বিক্রি হয়েছে। যদিও আইফোন ৬ প্লাস একটি বড় স্ক্রিন সাইজের ফোন, তবুও এর ওজন মাত্র ১২৯ গ্রাম। আইফোন ৬ এবং ৬ প্লাস দিয়ে অ্যাপল যে উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে মোবাইল ফোন জগতে, তা এখনো বিদ্যমান এবং বর্তমানে আইফোনের প্রিমিয়াম কোয়ালিটি এবং উচ্চমাত্রার দামের কারণে এটি একরকম দামী অলংকারে পরিণত হচ্ছে বললে ভুল হবে না।

Nokia 1100 & 1110, মোট বিক্রয়: ২৫০ মিলিয়ন

Nokia 1100 & 1110,
সর্বাধিক বিক্রিত ফোনের শিরোপা যাচ্ছে নোকিয়া ১১০০ এবং ১১১০

নোকিয়া ১১০০ এবং নোকিয়া ১১১০ এই দুটো মডেল সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত ফোন। দুটি ফোনই প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ইউনিট বিক্রয় হয় পুরো বিশ্বে। ২০০৩ সালে নোকিয়া ১১০০ এবং ২০০৫ সালে নোকিয়া ১১১০ মডেলটি বের হয়। এই ফোনগুলোর না ছিল কোনো ক্যামেরা, ছিল না কোনো কালার স্ক্রিনও। তবুও এই ফোন দুটির এত বিক্রয় হবার কারণ হলো, মূলত নোকিয়া এই ফোনদ্বয় দিয়ে টার্গেট করেছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। পৃথিবীতে প্রচুর মানুষ আছে যাদের কোনো আইফোনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু একটি মুঠোফোনের প্রয়োজন! যার মাধ্যমে যোগাযোগটা অন্ততপক্ষে রক্ষা করা যায়। সেসব মানুষের নোকিয়া ১১০০ বা ১১১০ এর মতো একটি ফোনের প্রয়োজন ছিল। ফোনগুলোতে ছিল ফ্ল্যাশলাইট, কম্পোজার, ক্যালকুলেটর ইত্যাদি। ২০০৯ সালে নোকিয়া ১১০০ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। উৎপাদন বন্ধ হবার আগে নোকিয়া ১১০০ এর জার্মানিতে তৈরি হওয়া কিছু মডেলের সফটওয়্যারে একধরনের ত্রুটি ধরা পরে। কিছু কিছু মডেল এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছিলো যাতে তা অন্য ফোনের সেন্সিটিভ মেসেজ, যেমন অনলাইন ব্যাংকিংয়ের তথ্যসমূহ সংগ্রহ করতে পারে। এরকম কিছু নোকিয়া ১১০০ মডেল ৩২,০০০ ডলারেরও অধিক মূল্যে বিক্রি হয়েছিল!

Leave a Reply